দেশের অন্যতম বৃহৎ ইসলামী ওয়েবসাইটে স্বাগতম 

আকীদা শেখায় কানযুল ঈমান।

মিসবাহুল ইসলাম আকিব

কানযুল ঈমান। পৃথিবীর বুকে কালামে পাকের অতুলনীয়, অদ্বিতীয় অনুবাদগ্রন্থ। লিখেছেন শতাব্দিকালের মুজাদ্দিদ ইমাম আহমদ রযা খান ফাজেলে বেরেলভী রহঃ। অনুবাদগ্রন্থের মধ্যে অনবদ্য রচনা হওয়ার পাশাপাশি 'কানযুল ঈমান'- এর রয়েছে চমকপ্রদ কিছু বৈশিষ্ট্য। যা অন্যদের থেকে আলা হযরতের এই গ্রন্থকে সম্পূর্ণ পৃথক মর্যাদা প্রদান করেছে। তাঁর অন্যতম একটি হলো, আকীদা সচেতনতা। এক্ষেত্রে যেসকল ভুল-ত্রুটি বহু গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে, সে ব্যাপারে পূর্ণ সচেতনতা রেখেই এ গ্রন্থ অনুবাদ করা হয়েছে। ইনশাআল্লাহ, কানযুল ঈমানের কতিপয় ঝলক দেখেই সংক্ষেপে লেখার ইতি টানবো।

সূরা বাকারার ২য় নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে,
ذالك الكتاب لا ريب فيه.
এই আয়াতের তরজুমায় দেওবন্দের প্রধান মুফতি মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী লিখেন, " এই কিতাবে কোন সন্দেহ নেই।"
দেওবন্দের হাকিমুল উম্মত আশ্রাফ আলী থানবী সাহেব লিখেন, " এই কিতাব এমন, যাতে কোন সন্দেহ নেই।"
'লা রাইবা ফিহী'- আয়াতের 'ফিহী' অংশে দৃষ্টি ক্ষেপণ করলে 'ফি' অর্থ দাঁড়ায় স্থান বা কাল। অথচ উপরের দু'টি অনুবাদের কোনটিতেই স্থান বা কালের উল্লেখ নেই, অন্য কোন অনুবাদক এক্ষেত্রে সুক্ষদৃষ্টি দিতে পারেন নি। অনুবাদের এই কমতি মিটিয়েই আলা হযরত অনুবাদ করেন, " সেই উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন কিতাব, কোন সন্দেহের স্থান নয়।"
দৃষ্টিতে আরো ধরা দেয়, আয়াতে 'জালিকাল কিতাব' অংশে 'জালিকা' আরবি ব্যাকরণ রীতিতে দূরের কোন কিছুকে নির্দেশ করতে প্রয়োগ করা হয়। আলা হযরতের পূর্বে উল্লেখিত দু'জনের অনুবাদে 'এই কিতাব' বলে আয়াতের ঐ দৌরাত্ম্য লোপ পেয়েছে, যা কোরআনে ছিলো। কিন্তু আলা হযরত 'সেই' ইশারায় ঐ দূরবর্তী জিনিসকে আহ্বানের ব্যাকরণ যথাযথ প্রয়োগ করেছেন।


সূরা আল-ইমরানের ৫৪ নং আয়াতে এসেছে,
ومكرو ومكر الله.
আয়াতের অনুবাদে মুফতি মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী লিখেছেন, " এবং প্রতারণা করলো ঐ কাফিরেরা, আর আল্লাহও প্রতারণা করলেন। এবং আল্লাহর পাকড়াও সবচেয়ে ভালো।"
তরজমা শাব্দিক হয়েছে। কিন্তু আল্লাহর শানে 'প্রতারণা'র মতো দোষ-ত্রুটি সংযুক্ত করতে বিন্দুমাত্র সচেতনতা মস্তিষ্কে জাগে নি। শানে উলুহিয়তের সিলেবাসে সতর্কতার সাথে এই আয়াতের তরজুমা আলা হযরত এভাবেই করেছেন, " এবং কাফিররা প্রতারণা করেছে। আর আল্লাহ তাঁদেরকে ধ্বংস করার গোপন কৌশল অবলম্বন করেছেন, এবং আল্লাহ সর্বাপেক্ষা উত্তম গোপন তদবিরকারী।"

সূরা তাওবাহ'র ১৬৭ নং আয়াতে এসেছে,
نسوا الله فنسيهم.
মুফতি মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী এই আয়াতের অনুবাদ এইভাবে করেন, " ভুলে গেলো আল্লাহকে। তাই তিনিও তাঁদেরকে ভুলে গেলেন।"
থানবী সাহেব লিখেন, " তারা খোদার খেয়াল করে নি, তাই খোদাও তাঁদের খেয়াল করেন নি।"
তরজমা আপন জায়গায় ঠিক আছে। তবেঁ অতটা প্রভাবান্বিত হয় নি, যতটা আলা হযরতের তরজুমায় পাওয়া যায়, " তারা আল্লাহকে ছেড়ে বসেছে; সুতরাং আল্লাহও তাঁদেরকে ছেড়ে দিয়েছেন।"

হযরত ইয়াকুব আলাহিস সালাম সম্পর্কে সন্তানদের মন্তব্য আল্লাহ পাক সূরা ইউসুফের ৯৫ নং আয়াতে উদ্ধৃতি দেন এভাবে,
قالوا تالله انك لفي ضلالك القديم.

আয়াতের অনুবাদে মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী লেখেন, " লোকেরা বললো, আল্লাহর কসম! আপনি তো স্বীয় পূর্বের ভুলের মধ্যে আছেন।"
আল্লাহর নবীকে ভুলের কাতারে ঠেলে দিলেন অনায়াসে। কখনো কখনো শাব্দিক অনুবাদের চাকচিক্যময় শিকল থেকে বেরিয়ে আদবের অলংকার সাজাতে হয়। ঐটা রক্ষা হয় নি এই অনুবাদে। অথচ খোদার নবীর প্রতি আদবের পূর্ণমাত্রা ঢেলে দিয়ে আলা হযরত অনুবাদ করেছেন, " সন্তান বললো, আল্লাহর শপথ! আপনার ঐ পুরনো পুত্রস্নেহের মধ্যে আপনি বিভোর রয়েছেন।"

সূরা তোয়াহা'র ১২১ নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে,
عصى ادم ربه فغوى.

আয়াতের তরজুমায় দেওবন্দী আলেম আশেক ইলাহি মিরাঠী লিখেন, " আর আদম স্বীয় প্রভুর নাফরমানি করলেন। তৎক্ষণাৎ গোমরাহ হয়েছেন।"
নবীগণ নিষ্পাপ। যাঁদেরকে আল্লাহ পাক অতীত-ভবিষ্যতে গোনাহ থেকে মুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি দেন। আল্লাহর নবীকে গোমরাহ বলে নবীর শানে অসম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে এই অনুবাদে। তাজিম শেখাতে আলা হযরত তরজমা করেছেন এইভাবে, " এবং আদম থেকে স্বীয় প্রভুর নির্দেশ পালনে বিচ্যুতি সংঘটিত হলো; তখন যেই উদ্দেশ্য চেয়েছিলো, সেটার পথ পায় নি।"

সূরা দোহা'র ৭ নং আয়াতে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,
ووجدك ضالا فهدى.
আয়াতের অনুবাদে মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী লেখেন, " আর পেয়েছি গোমরাহিতে। অতঃপর পথ দেখিয়েছি।"
এখানেও শানে রেসালতের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শিত হয় নি। আল্লাহর নিষ্পাপ নবীকে কালিমা লেপনে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাজ করে নি। সরাসরি নবীকে গোমরাহির সার্টিফিকেট দেয়া হয়েছে। অথচ আলা হযরত এখানে এসে ইশকের দরিয়ায় নবীপ্রেমের স্রোতে অনুবাদ ভাসিয়েছেন। পৃথিবীতে এমন তরজমা অভূতপূর্ব। সঠিক দিশা দিয়ে আলা হযরত অনুবাদ করেছেন, " আর আপনাকে স্বীয় প্রেমে বিভোর পেয়েছেন, তখন নিজের দিকে পথ দেখিয়েছেন।"

নবী যদি গোমরাহ হয়, তাহলে পৃথিবীতে হেদায়েতপ্রাপ্ত আছেই বা কে! যারাই অনুবাদের ক্ষেত্রে আকীদার ব্যাপারে অসতর্ক ছিলো, তাঁদের অনুবাদগুলো কাফের-মুশরিকদের আজীবনের খোরাক জোগাবে। ওরা বলবে, দেখ! তোমাদের কোর'আনেই নবীকে গোমরাহ বলা হয়েছে! (নাউজুবিল্লাহ!)
আসুন, তাফহীমুল কোরানের মতো ঐসকল বিকৃত তরজমাকে একসাথে না বলি। আর প্রতিটি ঘরের বুকশেলফের উপরের তাকে আলা হযরতের অনুবাদ রাখি। কানযুল ঈমান দিয়ে সাজিয়ে ঈমানকে মজবুত করি।









নির্বাচিত বিষয়সমুহ
সর্বাধিক পঠিত প্রবন্ধসমুহ
গুরুত্বপূর্ণ পেইজগুলো

This page has 3559 hits